ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রিষ্টপূর্ব দশম শতকে । এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল । অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১২০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে । মহাভারতে পৌন্ড্র রাজ বাসুদেব এর উল্লেখ পাওয়া যায় ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্ৰাকৃত
সংস্কৃত
পালি
তামিল
৩২৭-৩২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের ভারত আক্রমণের সময় থেকে প্রকৃত ইতিহাস পাওয়া যায়। গ্রিক লেখকদের কথায় বাংলাদেশে 'গঙ্গারিডাই' নামে একটি শক্তিশালী জাতির বাসস্থান ছিল ভাগীরথী ও পদ্মার মধ্যবর্তী অঞ্চলে। গ্রিক গ্রন্থকারগণ গঙ্গারিডই ছাড়াও প্রাসিতায় নামে অপর এক জাতির উল্লেখ করেছেন। আলেকজান্ডারের আক্রমণের সময় বাংলার রাজা মাধাদি দেশ জয় করে পাঞ্জাব পর্যন্ত রাজ্য বিস্তার করেছিলেন। তিনি ছিলেন পাটালিপুত্রের নন্দবংশীয় কোন রাজা।
মহাস্থানগড় শিলালিপি ও দুর্ভিক্ষ মোকাবেলা:
পুণ্ড্রনগরে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মৌর্য আমলে বাংলায় যখন দুর্ভিক্ষ হতো, তখন রাষ্ট্র থেকে প্রজাদের সাহায্য করা হতো। লিপিটিতে 'গণ্ডক' ও 'কাকনিক' নামক মুদ্রার উল্লেখ আছে, যা থেকে তৎকালীন বাংলার উন্নত মুদ্রা ব্যবস্থার প্রমাণ পাওয়া যায়।
বিন্দুসারের শাসন:
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পুত্র বিন্দুসারও বাংলা অঞ্চল শাসন করেছিলেন। তিব্বতীয় ঐতিহাসিক তারানাথের মতে, বিন্দুসার ১৬টি নগর রাষ্ট্র জয় করে পূর্ব থেকে পশ্চিম সমুদ্র পর্যন্ত মৌর্য আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন, যার মধ্যে বাংলার একাংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
অশোকের সময় ধর্ম ও স্থাপত্য:
সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের ব্যাপক প্রসার ঘটে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং-এর বর্ণনা অনুসারে, তিনি বাংলার পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট এবং তাম্রলিপ্তে অনেকগুলো অশোক স্তম্ভ ও বৌদ্ধ বিহার দেখেছিলেন।
বাংলার মসলিন ও বস্ত্রশিল্প:
কৌটিল্যের 'অর্থশাস্ত্র' অনুযায়ী, মৌর্য আমলে বাংলার 'ব্ঙ্গ' ও 'পুণ্ড্র' অঞ্চলের ক্ষৌম (রেশম) ও দুকুল (মিহি সুতি) বস্ত্র পুরো ভারতজুড়ে সমাদৃত ছিল। বিশেষ করে পুণ্ড্রবর্ধনের সাদা ও মসৃণ সুতি বস্ত্রের কথা সেখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তর-কালো পালিশ করা মৃৎপাত্র (NBPW):
প্রত্নতাত্ত্বিক বিচারে মৌর্য আমলের বাংলার একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো 'উত্তর-কালো পালিশ করা মৃৎপাত্র' বা North Black Polished Ware। মহাস্থানগড় ও চন্দ্রকেতুগড় (পশ্চিমবঙ্গ) খনন করে এই বিশেষ ধরণের পাত্র পাওয়া গেছে, যা মৌর্য সংস্কৃতির বিস্তারের সাক্ষ্য দেয়।
তাম্রলিপ্তের গুরুত্ব:
মৌর্য আমলে তাম্রলিপ্ত (বর্তমান মেদিনীপুর) শুধু একটি বন্দর ছিল না, এটি ছিল একটি 'নগর-রাষ্ট্র' সমতুল্য। সম্রাট অশোক তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য এই তাম্রলিপ্ত বন্দর থেকেই শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়েছিলেন।
মগধের সাথে প্রশাসনিক সংযোগ:
পুণ্ড্রনগর ছিল মৌর্যদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক প্রদেশ বা 'ভুক্তি'। এখান থেকে একজন উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী (মহামাত্র) শাসনকার্য পরিচালনা করতেন, যিনি সরাসরি মগধের কেন্দ্রীয় শাসনের সাথে যোগাযোগ রাখতেন।
আরও কিছু তথ্য জেনে নেই
- প্রাচীন বাংলা মৌর্য শাসনের প্রতিষ্ঠাতা সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। এটি সর্বভারতীয় প্রথম সাম্রাজ্য।
- চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যকে বলা হয় ভারতের প্রথম সম্রাট। চন্দ্রতপ্ত মৌর্যের রাজধানী ছিল- পাটালিপুত্র।
- মহাস্থানগড়ে মৌর্য বংশ প্রতিষ্ঠিত হয় ৩২২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে নন্দবংশকে পরাজিত করে।
- আলেকজান্ডারের ভারত ত্যাগের পর তার সেনাপতি সেলুকাসকে পরাজিত করেন- চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য।
- গ্রিক দূত মেগাস্থিনিসকে দূত হিসেবে চন্দ্রগুপ্তের রাজদরবারে প্রেরণ করেন- সেলুকাস।
- গ্রিক পরিব্রাজক মেগাস্থিনিস কয়েক বছর অবস্থান করে মৌর্য শাসন সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ইন্ডিকা নামক গ্রন্থে লিপিবন্ধ করেন।
- ইন্ডিয়া নামকরণ করেন- প্রাচীন গ্রীকরা।
- মৌর্যবংশের মোট শাসক ছিলেন- ৯ জন।
বিন্দুসার মৌর্য বংশের দ্বিতীয় শাসক এবং রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের পুত্র। পিতা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকারসূত্রে পিতৃ-রাজত্ব লাভ করেন বিন্দুসার। সিংহাসন আরোহণকালে তিনি অমিত্রঘাত' অর্থাৎ শত্রু নিধনকারী উপাধি লাভ করেন। বিন্দুসারের রাজত্বকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনা ছিল তক্ষশীলার বিদ্রোহ (পাকিস্তান)। তক্ষশীলার এই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন যুবরাজ অশোক। বিন্দুসারের রাজত্বকালে একমাত্র শ্রেষ্ঠ অর্জন ছিল- কলিঙ্গ জয়। সম্রাট অশোকও উত্তরাধিকার সূত্রে সিংহাসনের অধিকারী হয়েছিলেন।
অমিত্রঘাত উপাধি
বিন্দুসারের সবচেয়ে পরিচিত উপাধি হলো অমিত্রঘাত। এটি একটি সংস্কৃত শব্দ যার অর্থ হলো শত্রু হননকারী। গ্রিক ঐতিহাসিকরা তাকে অমিত্রোকেটস নামে ডাকতেন।
আজীবক সম্প্রদায়ের পৃষ্ঠপোষকতা
বিন্দুসার আজীবক নামক একটি বিশেষ দার্শনিক বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অনুসারী ছিলেন। সেই সময়ে এই সম্প্রদায়ের জ্যোতিষী পিঙ্গলবৎস তাঁর রাজসভায় অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন।
বৈদেশিক কূটনৈতিক যোগাযোগ
সিরিয়ার তৎকালীন রাজা প্রথম অ্যান্টিওকাসের সাথে বিন্দুসারের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল। বিন্দুসার সিরিয়ার রাজার কাছে শুকনো ডুমুর, আঙ্গুর থেকে তৈরি মিষ্টি মদ এবং একজন সোফিস্ট বা গ্রিক দার্শনিক চেয়েছিলেন। অ্যান্টিওকাস দার্শনিক বাদে বাকি দুটি দ্রব্য পাঠিয়েছিলেন।
ডাইমেকাস ও ডায়োনিসিয়াস
বিন্দুসারের রাজসভায় মেগাস্থিনিসের উত্তরসূরি হিসেবে গ্রিক দূত ডাইমেকাস নিযুক্ত ছিলেন। এছাড়া মিশরের রাজা দ্বিতীয় টলেমি ফিলাডেলফাস ডায়োনিসিয়াস নামক একজন দূতকে তাঁর দরবারে প্রেরণ করেছিলেন।
তক্ষশিলার বিদ্রোহ
তাঁর শাসনামলে তক্ষশিলায় বিশাল গণবিদ্রোহ দেখা দিয়েছিল। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য তিনি প্রথমে তাঁর পুত্র সুসীমকে পাঠিয়ে ব্যর্থ হন এবং পরবর্তীতে বড় পুত্র অশোককে পাঠান। অশোক অত্যন্ত দক্ষতার সাথে সেই বিদ্রোহ দমন করেছিলেন।
সাম্রাজ্য রক্ষা ও কৌটিল্য
বিন্দুসারের রাজত্বকালের শুরুর দিকেও চাণক্য বা কৌটিল্য প্রধানমন্ত্রীর পদে বহাল ছিলেন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের গড়ে তোলা বিশাল সাম্রাজ্যের ঐক্য বজায় রাখা। তিনি দক্ষিণ ভারতের দাক্ষিণাত্য পর্যন্ত সাম্রাজ্য বিস্তারে বিন্দুসারকে সহায়তা করেছিলেন বলে অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।
উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। সম্রাট অশোকের (তৃতীয় শাসক) রাজত্বকালে। এসময় অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। এ প্রদেশের রাজধানী ছিল প্রাচীন পুণ্ড্রনগর। সম্রাট অশোকের একটি শিলালিপি পাওয়া যায় মহাস্থানগড়ে। সম্রাট অশোক সিংহাসন আরোহনে নিজ ভ্রাতাদের নির্মমভাবে হত্যা করেন ফলে তার উপাধি হয় চণ্ডাশোক। সম্রাট অশোক কলিঙ্গ যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। সম্রাট অশোক বৌদ্ধধর্মকে বিশ্বধর্মে পরিণত করেন। এজন্য তাকে বৌদ্ধ ধর্মের কনস্ট্যানটাইন (রোমান সম্রাট) বলা হয়।
উপাধি ও পরিচয়
শিলালিপিতে তাঁকে সাধারণত 'দেবনামপ্রিয়' (দেবতাদের প্রিয়) এবং 'প্রিয়দর্শী' (সুন্দর দর্শনের অধিকারী) নামে অভিহিত করা হয়েছে। অশোক ছিলেন বিন্দুসারের পুত্র এবং মৌর্য বংশের শ্রেষ্ঠ সম্রাট।
কলিঙ্গ যুদ্ধ ও ধর্ম পরিবর্তন
২৬১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে অশোক কলিঙ্গ জয় করেন। এই যুদ্ধের ভয়াবহ রক্তপাত দেখে তিনি মর্মাহত হন এবং চণ্ডাশোক থেকে ‘ধর্মাশোকে’ পরিণত হন। এরপর তিনি উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হন।
বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার
তিনি বৌদ্ধ ধর্মকে বিশ্বধর্মে রূপান্তরের জন্য তাঁর পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংঘমিত্রাকে শ্রীলঙ্কায় পাঠান। এছাড়াও তিনি ভারতের বিভিন্ন স্থানে ধর্ম মহামাত্র নামক রাজকর্মচারী নিয়োগ করেছিলেন।
তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি
অশোকের পৃষ্ঠপোষকতায় পাটালিপুত্রে তৃতীয় বৌদ্ধ সংগীতি (সম্মেলন) অনুষ্ঠিত হয়। এর সভাপতি ছিলেন মোগলিপুত্ত তিসা।
শিলালিপি ও লিপি
তিনিই প্রথম সম্রাট যিনি শিলালিপির মাধ্যমে সরাসরি প্রজাদের উদ্দেশ্যে বার্তা দিতেন। তাঁর শিলালিপিগুলো মূলত ব্রাহ্মী ও খরোষ্ঠী লিপিতে এবং প্রাকৃত ভাষায় লেখা। ১৮৩৭ সালে জেমস প্রিন্সেপ প্রথম অশোকের শিলালিপির পাঠোদ্ধার করেন।
জাতীয় প্রতীক ও স্থাপত্য
ভারতের বর্তমান জাতীয় প্রতীক ‘লায়ন ক্যাপিটাল’ সারনাথের অশোক স্তম্ভ থেকে নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তিনি মধ্যপ্রদেশের বিখ্যাত সাঁচি স্তূপ নির্মাণ করেন।
মহাস্থানগড় ও বাংলা
বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রাপ্ত ব্রাহ্মী শিলালিপি থেকে প্রমাণিত হয় যে, উত্তর বঙ্গ (পুণ্ড্রবর্ধন) তাঁর সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
চাণক্য রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি বিষয়ে একজন দিকপাল ছিলেন। চাণক্য ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও বিন্দুসারের প্রধানমন্ত্রী ও উপদেষ্টা। চাণক্যের ছদ্মনাম 'কৌটিল্য' আর উপাধি- ‘বিষ্ণুখণ্ড’। কৌটিল্য রচিত গ্রন্থের নাম- 'অর্থশাস্ত্র' । ভারত চলে চাণক্য নীতিতে।
তার একটি উক্তিঃ “যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করাই উচিত।"
পরিচয় ও নাম
চাণক্যের প্রকৃত নাম ছিল বিষ্ণুগুপ্ত। তাঁর পিতার নাম চণক ছিল বলে তাঁকে চাণক্য বলা হয়। এছাড়া কূটনীতিতে পারদর্শী হওয়ায় তিনি কৌটিল্য নামেও পরিচিত। তাঁকে 'ভারতের ম্যাকিয়াভেলি' বলা হয়।
তক্ষশিলার শিক্ষক
তিনি প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত শিক্ষা কেন্দ্র তক্ষশিলা মহাবিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন।
মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা
চাণক্য ছিলেন সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রী। তিনি নন্দ বংশের শেষ রাজা ধননন্দকে পরাজিত করে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠায় প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
অর্থশাস্ত্র
তাঁর রচিত শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো 'অর্থশাস্ত্র', যা সংস্কৃত ভাষায় লেখা। এটি মূলত রাষ্ট্রশাসন, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সামরিক কৌশল বিষয়ক একটি আকর গ্রন্থ। গ্রন্থটি ১৫টি অধিকরণ বা খণ্ডে বিভক্ত।
সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব
কৌটিল্য তাঁর অর্থশাস্ত্রে রাষ্ট্রের সাতটি উপাদানের কথা বলেছেন, যা 'সপ্তাঙ্গ তত্ত্ব' নামে পরিচিত। এই উপাদানগুলো হলো— স্বামী (রাজা), আমাত্য (মন্ত্রী), জনপদ (ভূমি ও জনসংখ্যা), দুর্গ, কোষ (রাজস্ব), দণ্ড (সৈন্যবাহিনী) ও মিত্র।
গুপ্তচর ব্যবস্থা
তিনিই প্রথম রাষ্ট্রশাসনে একটি সুসংগঠিত ও শক্তিশালী গুপ্তচর ব্যবস্থার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং তাঁর গ্রন্থে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
শামশাস্ত্রী ও অর্থশাস্ত্র আবিষ্কার
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে (১৯০৫ সালে) আর. শামশাস্ত্রী প্রথম কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের পাণ্ডুলিপি আবিষ্কার করেন এবং ১৯০৯ সালে এটি প্রকাশ করেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
গুপ্ত যুগে বাংলা ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে।
গুপ্ত সাম্রাজ্য
ভারতের ইতিহাসে গুপ্তযুগ সামগ্রিকভাবে 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে খ্যাত। এ যুগে ভারতের কলা, স্থাপত্য ও ভাস্কর্য এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছায়। এ যুগের ভাস্কর্যকে ধ্রুপদী ভাস্কর্য বলা হয়।গুপ্ত যুগে বাংলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংহতি মূলত এই তিনজন প্রধান সম্রাটের হাত ধরেই মজবুত হয়েছিল:
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.)
তাকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। তার সময়েই বাংলার কিছু অংশ, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তি (প্রদেশ) গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হতে শুরু করে।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০–৩৮০ খ্রি.)
সমুদ্রগুপ্তের আমলেই বাংলার অধিকাংশ অঞ্চল গুপ্ত শাসনের অধীনে আসে। তার এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে, তিনি পশ্চিম বাংলার 'পুষ্করণ' (বর্তমান বাঁকুড়া জেলা) জয় করেছিলেন।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্য (৩৮০–৪১৫ খ্রি.)
তার সময়ে বাংলায় গুপ্ত শাসন পূর্ণতা পায়। সমগ্র বাংলাই (সমতটসহ) কার্যত তার সাম্রাজ্যের অংশে পরিণত হয়। দিল্লির মেহরাউলি লৌহস্তম্ভ লিপি অনুযায়ী, তিনি বাংলার রাজাদের একটি সম্মিলিত জোটকে পরাজিত করেছিলেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ভারতের ইতিহাসে স্বর্ণযুগ হিসেবে বিবেচনা করা হয় গুপ্ত যুগকে। গুপ্ত বংশের নামমাত্র প্রতিষ্ঠাতা শ্ৰীগুপ্ত । গুপ্ত বংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা বলা হয় প্রথম চন্দ্রগুপ্তকে। প্রথম চন্দ্রগুপ্তের উপাধি মহারাজাধিরাজ। চন্দ্রগুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল পাটালিপুত্রে। গুপ্তদের সময়ে রাজতন্ত্র ছিল সামন্ত নির্ভর। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসককে বলা হতো মহাসামন্ত। মৌর্যদের মতো এদেশে গুপ্তদের রাজধানী ছিল মহাস্থানগড়ের পুণ্ড্রনগর।
প্রথম চন্দ্রগুপ্ত (৩২০-৩৪০ খ্রি.) ছিলেন ভারতে গুপ্তবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা।
উপাধি: তিনি প্রথম গুপ্ত রাজা যিনি 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করেন। এটি তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক ছিল।
গুপ্তাব্দ (Gupta Era):প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ৩২০ খ্রিস্টাব্দের (মতান্তরে ৩১৯-৩২০) সিংহাসনে আরোহণের সময় এই অব্দের প্রচলন করেন তাঁর সিংহাসন আরোহণ উপলক্ষে 'গুপ্তাব্দ' বা গুপ্ত সংবতের প্রচলন করেন। এটি পরীক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বৈবাহিক সম্পর্ক: তিনি লিচ্ছবি রাজকন্যা কুমারদেবীকে বিবাহ করেন। এই বিবাহের ফলে তাঁর রাজনৈতিক শক্তি ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
মুদ্রা: তাঁর সময়ে 'রাজা-রানী' শৈলীর স্বর্ণমুদ্রা প্রচলিত ছিল, যাকে 'লিচ্ছবি প্রকার' মুদ্রাও বলা হয়। মুদ্রার একপিঠে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত ও কুমারদেবীর ছবি এবং অন্যপিঠে 'লিচ্ছবয়াঃ' (Licchavayah) কথাটি খোদাই করা ছিল।
সাম্রাজ্য বিস্তার: তিনি মগধ, সাকেত (অযোধ্যা) এবং প্রয়াগ (এলাহাবাদ) পর্যন্ত তাঁর সাম্রাজ্য বিস্তার করেছিলেন।
উত্তরাধিকারী: তাঁর পর তাঁর পুত্র সমুদ্রগুপ্ত সিংহাসনে বসেন, যাঁকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
সমুদ্র গুপ্তের শাসনকাল ছিল ৩৪০-৩৮০ খ্রিস্টাব্দ। গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ শাসক সমুদ্রগুপ্ত সমগ্র বাংলা জয় করেন। তাঁকে প্রাচীন ভারতের "নেপোলিয়ন" বলা হয়। সমুদ্রগুপ্তের রাজত্বকালে সমগ্র বাংলা জয় করা হলেও সমতট ছিল করদ রাজ্য।
সমুদ্রগুপ্ত (৩৪০-৩৮০ খ্রি.) ছিলেন গুপ্ত বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। তাঁকে 'প্রাচীন ভারতের নেপোলিয়ন' বলা হয়। গুপ্ত অধিকৃত বাংলার রাজধানী ছিল পুণ্ড্রনগর।
ভারতের নেপোলিয়ন: সমুদ্রগুপ্তের বীরত্ব এবং অপ্রতিহত সামরিক বিজয়ের কারণে ঐতিহাসিক ভি. এ. স্মিথ তাঁকে 'ভারতের নেপোলিয়ন' বলে অভিহিত করেছেন।
এলাহাবাদ প্রশস্তি: তাঁর সভাকবি হরিষেণ সংস্কৃত ভাষায় 'এলাহাবাদ প্রশস্তি' বা 'প্রয়াগ প্রশস্তি' রচনা করেন। এটি সমুদ্রগুপ্তের দিগ্বিজয় জানার প্রধান উৎস।
উপাধি: তিনি 'কবিরাজ', 'অশ্বমেধ পরাক্রম', 'পরাক্রমাঙ্ক' এবং 'সর্বরাজোচ্ছেত্তা' উপাধি ধারণ করেছিলেন।
রাজ্যজয়ের নীতি: তিনি উত্তর ভারতের জন্য 'উন্মূলকরণ' (রাজ্য দখল) এবং দক্ষিণ ভারতের ১২ জন রাজার ক্ষেত্রে 'গ্রহণ-মোক্ষ-অনুগ্রহ' (রাজ্য জয় করে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া) নীতি গ্রহণ করেন। একে 'ধর্মবিজয়' বলা হয়।
ধর্মীয় সহনশীলতা: তিনি নিজে পরম বৈষ্ণব হলেও বৌদ্ধ পণ্ডিত বসুবন্ধু তাঁর দরবারে উচ্চপদে আসীন ছিলেন। সিংহলের রাজা মেঘবর্মণ তাঁর অনুমতি নিয়ে গয়ায় বৌদ্ধ মঠ নির্মাণ করেছিলেন।
মুদ্রা: তিনি স্বর্ণমুদ্রা প্রচলন করেছিলেন যা 'দিনার' নামে পরিচিত ছিল। তাঁর মুদ্রায় অশ্বমেধ যজ্ঞের ছবিও পাওয়া যায়।
দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত (৩৮০-৪১৫ খ্রি.) সমুদ্রগুপ্তের মৃত্যুর পর পাটলিপুত্রের সিংহাসনে বসেন। তিনি মালবের উজ্জয়িনীতে সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করেন। 'বিক্রমাদিত্য' ছিল তাঁর উপাধি। তাঁর শাসনকালে গুপ্ত সাম্রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়। অনেক প্রতিভাবান ও গুণী ব্যক্তি বিক্রম দরবারে সমবেত হয়েছিলেন। এঁদের মধ্যে প্রধান নয়জনকে 'নবরত্ন' বলা হয় যথা- কালিদাস, অমরসিংহ, বরাহমিহির প্রমুখ। মহাকবি কালিদাস সংস্কৃত ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ও নাট্যকার। তাঁর রচনাবলির মধ্যে মালবিকাগ্নিমিত্র, অভিজ্ঞানশকুন্তল নাটক, রঘুবংশ ও কুমারসম্ভব মহাকাব্য এবং মেঘদূত ও ঋতুসংহার গীতিকাব্য সাহিত্যমাধুর্যে অতুলনীয়। অমরসিংহ ছিলেন সংস্কৃত কবি, ব্যাকরণবিদ এবং প্রাচীন ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ অভিধান প্রণেতা। তাঁর প্রসিদ্ধ সংস্কৃত অভিধান 'অমরকোষ'। বরাহমিহির ছিলেন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'বৃহৎ সংহিতা'।
৬ষ্ঠ শতকের প্রথমার্ধে ভারতে বিশাল গুপ্ত সম্রাজ্যের পতন ঘটে। মধ্য এশিয়ার দুর্ধর্ষ যাযাবর জাতি হুনদের আক্রমণে টুকরো টুকরো হয়ে যায় গুপ্ত সাম্রাজ্য।
সমুদ্রতন্ত্রের মৃত্যুর পর পাটালিপুত্রের সিংহাসনে বসেন দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। তাঁর উপাধি ছিল 'বিক্রমাদিত্য'। তিনি নবরত্নের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
যেমনঃ
- কাপিলাস (মেঘনৃত)
- অমরসিংহ (অমরকোষ)
- বরাহমিহির (বৃহৎ সংহিতা)
দ্বিতীয় চন্দ্রখণ্ডের শাসনামলে চৈনিক তীর্থযাত্রী ফা-হিয়েন ভারতবর্ষে এসেছিলেন। ফা-হিয়েন-ই প্রথম চীনা পরিব্রাজক হিসেবে ভারতবর্ষে এসেছিলেন। তাঁর ভারত সফরের ৭টি বইয়ের মধ্যে ফো-কুয়ো-কিং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
গৌড় রাজ্য ছিল বাংলা অঞ্চলের প্রথম স্বাধীন রাজ্য, যার প্রতিষ্ঠাতা ও শক্তিশালী শাসক ছিলেন রাজা শশাঙ্ক , যিনি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে সামন্ত হিসেবে শুরু করে পরে স্বাধীন হন এবং তাঁর রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ (বর্তমান মুর্শিদাবাদে)। শশাঙ্ক সমগ্র বাংলা অঞ্চলকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন, যা বাংলার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, এবং তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন।
শশাঙ্ক প্রথম গৌড়ে রাজ্য স্থাপন করেন। শশাঙ্কের ধর্ম ছিল- শৈব। তিনি ছিলেন প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে প্রথম সার্বভৌম নৃপতি রাজা । গুপ্তদের অধীনে বড় অঞ্চলের শাসকদের পদবি ছিল- মহাসামন্ত। শশাঙ্কের রাজধানীর নাম- কর্ণসুবর্ণ (মুর্শিদাবাদে অবস্থিত)। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেনগুপ্তের একজন মহাসামন্ত অথবা ভ্রাতুষ্পুত্র। হিউয়েন সাঙ রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধ ধর্মের নিগ্রহকারী হিসেবে অভিহিত করেছেন। শশাঙ্ক মৃত্যুবরণ করেন- ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দের দিকে ।
প্রথম স্বাধীন রাজা: শশাঙ্ক ছিলেন প্রাচীন বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা।
রাজত্বকাল: তিনি আনুমানিক ৫৯০/৬০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬২৫/৬৩৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত গৌড় রাজত্ব করেন।
রাজধানী: তাঁর রাজধানীর নাম ছিল কর্ণসুবর্ণ, যা বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় অবস্থিত।
পূর্বপরিচয়: শশাঙ্ক প্রথম জীবনে পরবর্তী গুপ্ত বংশের রাজা মহাসেনগুপ্তের একজন মহাসামন্ত ছিলেন।
গৌড়তন্ত্র: তিনি বাংলার একটি শক্তিশালী শাসনব্যবস্থা বা রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলেন, যা ইতিহাসে 'গৌড়তন্ত্র' নামে পরিচিত।
ধর্মীয় পরিচয়: শশাঙ্ক অত্যন্ত গোঁড়া শৈব (শিবের উপাসক) ছিলেন।
বৌদ্ধ বিদ্বেষ: চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ এবং হর্ষবর্ধনের সভাকবি বাণভট্ট তাঁদের লেখায় শশাঙ্ককে বৌদ্ধধর্মের নিগ্রহকারী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এমনকি তিনি বুদ্ধগয়ার 'বোধিবৃক্ষ' উপড়ে ফেলেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রধান শত্রু ও যুদ্ধ: তিনি কনৌজের মৌখরী রাজা গ্রহবর্মনকে হত্যা করেন।
তিনি থানেশ্বরের রাজা এবং হর্ষবর্ধনের ভাই রাজ্যবর্ধনকে হত্যা করেন।
হর্ষবর্ধন তাঁর ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ নিতে শশাঙ্কের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।
বঙ্গাব্দ প্রবর্তন: অনেক ঐতিহাসিকের মতে, শশাঙ্ক তাঁর সিংহাসন আরোহণের দিন থেকে বঙ্গাব্দ বা বাংলা নববর্ষ গণনা শুরু করেন।
মুদ্রা: তিনি স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রচলন করেন, যা 'দিনার' নামে পরিচিত ছিল। তাঁর মুদ্রায় শিব ও ষাঁড়ের প্রতিকৃতি থাকত
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মাৎস্যন্যায় (Matsyanyayam)
শশাঙ্কের পর দীর্ঘদিন বাংলায় কোনো যোগ্য শাসক ছিলনা। ফলে রাজ্যে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতা দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় শাসন শক্তভাবে ধরার মত কেউ ছিলনা। সামন্ত রাজারা প্রত্যেকেই বাংলার রাজা হওয়ার কল্পনায় অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকেন। এ অরাজকতাপূর্ণ সময় (৭ম-৮ম শতক) কে পাল তাম্র শাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে 'মাৎস্যন্যায়' বলে। সন্ধ্যাকর নন্দীর 'রামচরিতম' কাব্যেও পাল বংশের অব্যবহিত পূর্ববর্তী সময়ের বাংলার নৈরাজ্যকর অবস্থাকে মাৎসন্যায়ম্ বলে উল্লেখ করা হয়। পুকুরে বড় মাছগুলো শক্তির দাপটে ছোট মাছ ধরে ধরে খেয়ে ফেলার বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে 'মাৎস্যন্যায়'। বাংলার সবল অধিপতিরা এমনি করে ছোট ছোট অঞ্চলগুলোকে গ্রাস করেছিল।
শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলার ইতিহাসে প্রায় ১০০ বছর (সপ্তম-অষ্টম শতক) ধরে এক দুর্যোগপূর্ণ অন্ধকারময় যুগের সূচনা সময়কালকে মাৎস্যন্যায় বলা হয়। বাংলার অরাজকতার সময়কালকে পাল তাম্রশাসনে আখ্যায়িত করা হয়েছে মাৎস্যন্যায়। পুকুরে বড় মাছ ছোট মাছকে ধরে গিলে ফেলার মতো বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে বলে মাৎস্যন্যায়। এ অরাজকতার যুগ চলে একশ বছরব্যাপী। অষ্টম শতকের মাঝামাঝি এ অরাজকতার অবসান ঘটে পাল রাজত্বের উত্থানের মধ্য দিয়ে। [তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (দশম শ্রেণী)]
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
হর্ষবর্ধনের রাজত্বকালের চীনা বৌদ্ধ পণ্ডিত হিউয়েন সাঙ ভারত সফরে আসেন। হিউয়েন সাঙ নালন্দা মহাবিহারের অধ্যক্ষ শীলভদ্রের কাছে ১৪ বছর বৌদ্ধ ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। হিউয়েন সাত সিন্ধি নামে এক গ্রন্থ রচনা করেন। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন অধ্যাপক নাগার্জুন, আর্যদেব, শীলভদ্র, ধর্মপাল। হিউয়েন সাত রাজা শশাঙ্ককে বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী বলে আখ্যায়িত করেন। সভাকবি বানভী হর্ষবর্ধনের জীবনীমূলক গ্রন্থ 'হর্ষচরিত' রচনা করেন।
হর্ষবর্ধন (৬০৬ - ৬৪৭ খ্রি.) পুষ্যভূতি বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা। হর্ষবর্ধনের সভাকবি ছিলেন বানভট্ট। বানভট্টের বিখ্যাত গ্রন্থ 'হর্ষচরিত'।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে বাংলার প্রাকৃতিক সম্পদ, উর্বর ভূমি, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের আকর্ষণে বহু বিদেশি পরিব্রাজক ও পর্যটক বাংলায় আগমন করেন। তাঁদের ভ্রমণবৃত্তান্ত থেকে তৎকালীন বাংলার সমাজ, অর্থনীতি, ধর্ম ও জীবনযাত্রা সম্পর্কে মূল্যবান ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়।
গ্রিক পর্যটক মেগাস্থিনিস খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতকে মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে অবস্থান করেন। তাঁর রচিত গ্রন্থ ইন্ডিকা-তে মৌর্য যুগের প্রশাসন, সমাজ ও অর্থনৈতিক অবস্থার বর্ণনা পাওয়া যায়। যদিও বাংলায় তাঁর সরাসরি আগমনের সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই, বৃহত্তর মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়।
চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু ফা-হিয়েন গুপ্ত যুগে বাংলায় ভ্রমণ করেন। তিনি তাম্রলিপ্ত বন্দরের উল্লেখ করেছেন এবং বাংলায় বৌদ্ধ ধর্মের প্রসার, অহিংস জীবনধারা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রদান করেছেন। তাঁর বিবরণ থেকে জানা যায়, সে সময় বাংলায় বৌদ্ধ বিহার ও সন্ন্যাসীর সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য।
আরেক চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং সপ্তম শতকে বাংলায় আগমন করেন। তিনি হর্ষবর্ধনের সমসাময়িক ছিলেন এবং নালন্দা মহাবিহারে অধ্যয়ন করেন। তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্তে বাংলার প্রশাসন, শিক্ষা ও ধর্মীয় অবস্থার সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।
মধ্যযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলিম পরিব্রাজক ইবনে বতুতা ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। তিনি সিলেট, সোনারগাঁও ও চট্টগ্রাম অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং বাংলার নদীপথ, বন্দর, বাজার ব্যবস্থা ও সুফিবাদের প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ দেন। তাঁর লেখায় শাহজালাল (র.)-এর কথা বিশেষভাবে উল্লেখিত।
চীনা পরিব্রাজক ই-সিং সপ্তম শতকে বাংলায় ভ্রমণ করে এখানকার খাদ্যাভ্যাস, কৃষিকাজ ও লোকজ বিশ্বাসের বর্ণনা দিয়েছেন। পরে মা হুয়ান (১৫শ শতক) জেং হি–এর অভিযানের সঙ্গী হিসেবে বাংলায় আসেন এবং তাঁর বিবরণে বাংলার সমাজ, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির বস্তুনিষ্ঠ চিত্র পাওয়া যায়।
এ ছাড়া ইতালির নিকালো মানুচ্চি, গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমি, পর্তুগিজ দুয়ার্তে বারবোসা, ইংরেজ রালফ ফিচসহ বহু বিদেশি পর্যটক বাংলায় এসে এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের বিবরণ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাস রচনায় অমূল্য উৎস হিসেবে বিবেচিত।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মেগাস্থিনিস ছিলেন একজন প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসবিদ, কূটনীতিবিদ এবং হেলেনিস্টিক যুগে ভারতীয় নৃতত্ত্ববিদ ও অনুসন্ধানকারী। তিনি প্রাচীন গ্রিস এর একজন পর্যটক এবং ভূগোলবিদ। সিরিয়ার রাজা প্রথম সেলুকাসের দূত হিসেবে ভারতীয় রাজা চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য এর রাজদরবারে আসেন। তিনি যখন ভারতে আসেন তখন চন্দ্রগুপ্তের রাজদরবার ছিল ভারতের পাটালিপুত্র নামক স্থানে।
বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর লিখিত বিশ্ববিখ্যাত বইটির নাম 'ইন্ডিকা' (Indica)। যদিও মূল বইটি বর্তমানে বিলুপ্ত, তবে আরিয়ান ও স্ট্রাবোর মতো পরবর্তী গ্রীক লেখকদের উদ্ধৃতি থেকে এর তথ্যগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
পরিচয়: তিনি ছিলেন প্রাচীন গ্রীক ইতিহাসবিদ ও কূটনীতিবিদ। তাঁকে 'ভারতীয় ইতিহাসের জনক' (Father of Indian History) বলা হয়।
আগমনকাল: ৩৩৫-৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে তিনি সিরিয়ার রাজা প্রথম সেলুকাস নিকেটরের দূত হিসেবে ভারত ভ্রমণ করেন।
রাজদরবার: তিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজদরবারে এসেছিলেন।
সপ্ত-জাতিতত্ত্ব: মেগাস্থিনিস তাঁর বর্ণনায় তৎকালীন ভারতীয় সমাজকে ৭টি শ্রেণিতে বা ভাগে বিভক্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
এগুলো হলো:
- দার্শনিক
- কৃষক (সবচেয়ে বড় শ্রেণি)
- পশুপালক ও শিকারি
- কারিগর ও শিল্পী
- যোদ্ধা বা সামরিক বাহিনী
- পরিদর্শক বা গুপ্তচর।
- অমাত্য বা মন্ত্রণাদাতা।
পৌর প্রশাসন: পাটলিপুত্র শহরের শাসন পরিচালনার জন্য ৩০ জন সদস্যের একটি পরিষদ ছিল, যারা ৬টি কমিটিতে (প্রতিটিতে ৫ জন) বিভক্ত হয়ে কাজ করত।
দাস প্রথা: তাঁর মতে, ভারতে কোনো দাস প্রথা ছিল না। যদিও আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে, গ্রীক দাসদের তুলনায় ভারতীয় দাসদের অবস্থা অনেক ভালো হওয়ায় তিনি হয়তো তাদের পার্থক্য করতে পারেননি।
নামকরণ: তিনি পাটলিপুত্র শহরকে 'পালিবোথরা' (Palibothra) নামে বর্ণনা করেছিলেন।
ধর্মীয় উল্লেখ: তিনি তাঁর বর্ণনায় 'ডায়োনিসাস' (শিব) এবং 'হেরাক্লেস' (কৃষ্ণ) নামক দুই দেবতার উল্লেখ করেছিলেন
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
ফা-হিয়েন চীনের শানসি প্রদেশে আনুমানিক ৩৩১ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল কুঙ্গ। বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার পর ফা-হিয়েন রাখা হয়েছিল। তিনি চীন দেশের পরিব্রাজক ছিলেন। ৩৯৯ খ্রিষ্টাব্দের প্রথম দিকে চীনের রাজধানী চ্যাংগান থেকে ভারতের দিকে রওনা হয়েছিলেন। চ্যাংগান আর পুরনো নাম ছিল হাইফেং এবং পরবর্তীতে নামকরণ হয় সিয়ান।
বিখ্যাত গ্রন্থ: ফা-হিয়েন রচিত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থটির নাম 'ফো-কু-কি' (Fo-Kwo-Ki), যার অর্থ হলো 'বৌদ্ধ দেশগুলোর বিবরণ'।
পরিচয়: তিনি ছিলেন ভারতে আসা প্রথম চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী।
আগমনকাল: তিনি ৩৯৯ খ্রিস্টাব্দে চীন থেকে যাত্রা শুরু করেন এবং প্রায় ৪০০-৪১১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারতে অবস্থান করেন।
ভারতে আসার : তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল গৌতম বুদ্ধের পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো দর্শন করা এবং বৌদ্ধ বিনয় বিধি বা 'বিনয় পিটক'-এর মূল পান্ডুলিপি সংগ্রহ করা।
ভারত সম্পর্কে বর্ণনা: তিনি তৎকালীন মগধকে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পাটলিপুত্র শহর সম্পর্কে তিনি বিস্তারিত লিখেছেন এবং সেখানে তিনি ৩ বছর সংস্কৃত ভাষা শিখেছিলেন। তৎকালীন শাসনব্যবস্থার প্রশংসা করে তিনি বলেন যে, সেই সময় অপরাধের শাস্তি হিসেবে মূলত জরিমানা করা হতো এবং মৃত্যুদণ্ড বা শারীরিক নির্যাতন খুব একটা ছিল না।
তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে ভারতবাসী ছিল নিরামিষাশী এবং সমাজে মদ্যপান বা পেঁয়াজ-রসুনের প্রচলন ছিল না।
ভ্রমণ পথ: তিনি মধ্য এশিয়া হয়ে স্থলপথে ভারতে আসেন এবং ফেরার সময় তাম্রলিপ্ত (বর্তমান মেদিনীপুর) থেকে সমুদ্রপথে সিংহল ও জাভা হয়ে চীনে ফিরে যান
মা হুয়ান ছিলেন চীনা পরিব্রাজক। তিনি ১৪০৬ সালে গিয়াসউদ্দিন আযম শাহের আমলে উপমহাদেশে আসেন।
পরিচয়: মা-হুয়ান ছিলেন একজন বিখ্যাত চীনা পর্যটক, লেখক এবং অনুবাদক। তিনি ধর্মীয়ভাবে একজন চীনা মুসলিম ছিলেন।
কার রাজত্বকালে আসেন: মা-হুয়ান যখন বাংলায় আসেন, তখন বাংলার সুলতান ছিলেন ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ (কারো মতে জালালউদ্দিন মুহাম্মদ শাহ)।
বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর লিখিত ভ্রমণকাহিনী বা বইয়ের নাম 'ইং-ইয়াই শেং-লান' (Ying-yai Sheng-lan), যার অর্থ 'সমুদ্র তীরের সামগ্রিক জরিপ'।
গুরুত্ব: তাঁর লেখা থেকে তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায়। বাংলার সমাজ ও অর্থনীতি নিয়ে বর্ণনা:তিনি বাংলাকে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং জনবহুল দেশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রেশম ও মসলিন: তিনি তৎকালীন বাংলায় রেশম চাষ এবং উচ্চমানের মসলিন কাপড় তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন।
কাগজ শিল্প: মা-হুয়ানের বর্ণনা থেকে জানা যায় যে, সেই সময়ে বাংলায় ছাল জাতীয় উপাদান থেকে এক ধরণের সাদা কাগজ তৈরি হতো।
মুদ্রা: তিনি বাংলায় রৌপ্য মুদ্রা বা 'টাকা' এবং ক্ষুদ্র লেনদেনের জন্য 'কড়ি'র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন।
সম্পৃক্ততা: তিনি চীনের মিং রাজবংশের বিখ্যাত অ্যাডমিরাল ঝেং হে-র (Zheng He) নৌ-অভিযানের দোভাষী হিসেবে ভারত ও বাংলা ভ্রমণ করেছিলেন।
ইবনে বতুতা ছিলেন মুসলিম পরিব্রাজক। তিনি ১৩০৪ সালে মরোক্কোয় জন্মগ্রহণ করেন এবং মোহাম্মদ বিন তুঘলকের শাসনামলে ১৩৩৩ সালে ভারতবর্ষে আগমণ করেন। তিনি বাংলায় আসেন ফখরুদ্দিন মোবারক শাহের আমলে। ইবনে বতুতা প্রথমে বিদেশি পর্যটক হিসেবে বাঙ্গালা শব্দ ব্যবহার করেন। জীবনের নিত্যনৈমিত্তিক দ্রব্যের প্রাচুর্য ও স্বল্পমূল্য আর মনোরম প্রাকৃতিক দৃশ্য বতুতাকে আকৃষ্ট করলেও এ দেশএর আবহাওয়া তার পছন্দ হয়নি। এজন্য তিনি বাংলার নামকরণ করেন ধনসম্পদপূর্ণ নরক। ইবনে বতুতার কিতাবুল রেহালা নামক গ্রন্থে বাংলার অপরূপ সৌন্দর্যের বর্ননা পাওয়া যায়।
- পরিচয়: তিনি ছিলেন মধ্যযুগের শ্রেষ্ঠ মুসলিম পর্যটক এবং একজন প্রখ্যাত মরোক্কান পন্ডিত। তাঁকে 'পর্যটকদের রাজপুত্র' বলা হয়।
- বিখ্যাত গ্রন্থ: তাঁর ভ্রমণকাহিনীর নাম 'কিতাব-উল-রেহলা' (Kitab-ul-Rihla)।
- ভারত আগমন: ১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলকের রাজত্বকালে ভারতে আসেন।সুলতান তাঁকে দিল্লির 'কাজী' (বিচারক) হিসেবে নিযুক্ত করেছিলেন। সুলতান তাঁকে তাঁর দূত হিসেবে চীনে পাঠিয়েছিলেন।
- বাংলা ভ্রমণ: তিনি ১৩৪৫-১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় আসেন। সেই সময় সোনারগাঁওয়ে স্বাধীন সুলতান ফখরুদ্দিন মুবারক শাহের রাজত্ব চলছিল।তিনি বাংলাকে তাঁর বইতে 'দোযখপুর-আয-নিয়ামত' (নেয়ামতপূর্ণ নরক) বলে অভিহিত করেছেন (প্রচুর সম্পদ কিন্তু আবহাওয়া ও পরিবেশগত কারণে)।
- হযরত শাহজালাল (র.) এর সাথে সাক্ষাৎ: তিনি সিলেটে এসে বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত শাহজালাল (র.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন।
- বাংলার সামাজিক বর্ণনা: তাঁর বর্ণনায় তৎকালীন বাংলায় দাস-দাসী কেনাবেচা এবং দ্রব্যমূল্যের সস্তা হওয়ার কথা উল্লেখ আছে (যেমন—একটি সুস্থ মোরগ এক দিরহামের ১/৮ অংশ দামে পাওয়া যেত)।
- ভ্রমণের বিস্তার: তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে আফ্রিকা, এশিয়া এবং ইউরোপের বিশাল অংশ ভ্রমণ করেছিলেন।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রাচীন শাসনামলে বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে বিভিন্ন রাজবংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মৌর্য সাম্রাজ্য
ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম সাম্রাজ্যের নাম মৌর্য সাম্রাজ্য।
চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৪ - ৩০০ অব্দ) মগধের সিংহাসনে আরোহণের মাধ্যমে ভারতে মৌর্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ভারতের প্রথম সম্রাট। পাটলিপুত্র ছিল তাঁর রাজধানী। তিনি চাণক্য নামে তক্ষশীলার এক তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন ব্রাহ্মণকে তাঁর প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। তক্ষশীলা নগরী ছিল অধুনা পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে অবস্থিত একটি প্রাচীন বিদ্যাচর্চার কেন্দ্র। চাণক্যের বিখ্যাত ছদ্মনাম কৌটিল্য, যা তিনি তাঁর বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' এ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতিকৌশলের সার সংক্ষেপ এই অর্থশাস্ত্র। চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য আলেকজান্ডারের সেনাপতি সেলিউকাসকে পরাজিত করে উপমহাদেশ হতে গ্রিকদের তাড়িয়ে দেন।
সম্রাট অশোক (খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩- ২৩২ অব্দ) এর রাজত্বকালে উত্তর বাংলায় মৌর্য শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। অঞ্চলটি মৌর্যদের একটি প্রদেশে পরিণত হয়েছিল। প্রাচীন পুণ্ড্রনগর ছিল এ প্রদেশের রাজধানী। 'কলিঙ্গের যুদ্ধ' সম্রাট অশোকের জীবনে ছিল এক মাইলস্টোন। যুদ্ধে কলিঙ্গ রাজ সম্পূর্ণ পরাজিত হন এবং এক লক্ষ লোক নিহত হয়। কলিঙ্গ যুদ্ধের রক্তস্রোত অশোকের মনে গভীর বেদনার রেখাপাত করে। তখন কৃতকর্মের অনুশোচনায় মূহ্যমান অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর শাসনামলে বৌদ্ধধর্ম রাজধর্ম হিসাবে স্বীকৃতি পায়। তাঁর চেষ্টায় বৌদ্ধধর্ম বিশ্বধর্মের মর্যাদা পায়। এজন্য তাঁকে 'বৌদ্ধধর্মের কনস্ট্যানটাইন' বলা হয়।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
রামাবতী ছিল বাংলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীন নগরী। এটি পাল রাজবংশের অন্যতম শক্তিশালী শাসক রাজা রামপাল কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং তার রাজধানী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। রামাবতী তার সৌন্দর্য এবং কৌশলগত অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিল।
অবস্থান ও প্রতিষ্ঠা
রামাবতী নগরী ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ছিল। কিছু সূত্রমতে, এটি বর্তমান রামপালের সাথে সংযুক্ত। শহরটি রাজা রামপাল (আনুমানিক ১০৭৭-১১২৯ খ্রিষ্টাব্দ) প্রতিষ্ঠা করেন এবং এটিকে তিনি তাঁর রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলেন। প্রাচীন নথি অনুযায়ী, রামাবতীকে রামপাল এবং সমতট রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজধানী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়।
সেন আমলে নবদ্বীপ বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেন রাজবংশের শাসনামলে (খ্রিষ্টীয় একাদশ–দ্বাদশ শতক) নবদ্বীপ ছিল বাংলার রাজধানী। বিশেষত লক্ষণ সেনের আমলে নবদ্বীপ প্রশাসনিক কেন্দ্রের পাশাপাশি সংস্কৃত শিক্ষা, ধর্মচর্চা ও সাহিত্যচর্চার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়। এই সময়ে নবদ্বীপে অসংখ্য টোল ও বিদ্যাপীঠ গড়ে ওঠে, যেখানে ব্যাকরণ, ন্যায়, স্মৃতি ও বেদশাস্ত্রের অধ্যয়ন হতো। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রভাব বৃদ্ধি পায় এবং নবদ্বীপ বাংলার হিন্দু সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
মলখেড (প্রাচীন নাম: মান্যখেত; প্রাকৃতে "মান্নখেড")হল ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের গুলবর্গা জেলার অন্তর্গত একটি গ্রাম। এই গ্রামটি উক্ত জেলার সেদাম তালুকে কাগিনা নদীর তীরে অবস্থিত। মলখেড ছিল খ্রিস্টীয় নবম ও দশম শতাব্দীতে রাষ্ট্রকূট রাজবংশের রাজধানী। রাষ্ট্রকূটদের পতনের পরেও পশ্চিম চালুক্য সম্রাটেরা ১০৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মলখেড থেকে রাজ্য শাসন করতেন।
পুষ্যভূতি রাজ্য
গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত অঞ্চলে কতকগুলো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের উৎপত্তি ঘটে। এদের মধ্যে বর্তমান পাঞ্জাবের পূর্বাঞ্চলে পুষ্যভূতি রাজ্যের অভ্যুদয় অন্যতম।
প্রতিহার রাজবংশ, যা গুর্জর-প্রতিহার বা কনৌজের প্রতিহার নামেও পরিচিত, মধ্যযুগীয় ভারতের একটি শক্তিশালী রাজবংশ ছিল। শুরুতে তারা গুর্জরদেশ শাসন করলেও ৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিপক্ষীয় সংগ্রামে বিজয় লাভের মাধ্যমে কনৌজের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়। এর ফলে প্রতিহাররা উত্তর ভারতের একটি সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত হয়। রাজবংশটির বিভিন্ন শাখা উপমহাদেশের নানা অঞ্চলে ছোট ছোট রাজ্য শাসন করত, যা তাদের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারে সহায়ক ছিল।
পুষ্যভূতি রাজবংশ উত্তর ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশ। এই বংশের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য না থাকলেও ধারণা করা হয়, তাদের পূর্বপুরুষরা পূর্ব-পাঞ্জাবে বসবাস করতেন এবং পরবর্তীকালে থানেশ্বর অঞ্চলে রাজত্ব স্থাপন করেন। বাণভট্টের বিবরণ অনুযায়ী, পুষ্যভূতিই এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ও হুন আক্রমণের ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এই বংশের উত্থান ঘটে। প্রভাকরবর্ধনের শাসনামলে (৫৮০–৬০৫ খ্রি.) পুষ্যভূতি রাজবংশ একটি শক্তিশালী সার্বভৌম রাজ্যে পরিণত হয়। হর্ষবর্ধনের মৃত্যুর পর (৬৪৭ খ্রি.) এই রাজবংশের পতন ঘটে।
পুষ্যভূতি রাজবংশের উল্লেখযোগ্য শাসক ছিলেন প্রভাকরবর্ধন, রাজ্যবর্ধন এবং হর্ষবর্ধন। প্রভাকরবর্ধন রাজ্যের ভিত্তি সুদৃঢ় করেন, রাজ্যবর্ধন স্বল্পকাল শাসন করেন এবং হর্ষবর্ধনের শাসনামলে উত্তর ভারতে রাজনৈতিক ঐক্য ও সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি লক্ষ করা যায়। হর্ষবর্ধনের শাসনকালকে পুষ্যভূতি রাজবংশের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় বলা হয়।
কনৌজ বা কন্নৌজ ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক শহর। এর প্রাচীন নাম ছিল কান্যকুব্জ। এই শহরটি একসময় হর্ষবর্ধনের সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল এবং পরবর্তীকালে প্রতিহার রাজবংশের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কনৌজ সুগন্ধী উৎপাদন ও বাণিজ্যের জন্য বিখ্যাত এবং হিন্দি ভাষার কনৌজি উপভাষার উৎপত্তিস্থল হিসেবেও পরিচিত। প্রাচীন ভারতের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসে কনৌজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কুষাণ সাম্রাজ্য
কনিষ্ক ছিলেন কুষাণ সাম্রাজ্যের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তাঁর চিকিৎসক ছিলেন চরক।চরক আয়ুর্বেদ চিকিৎসা পদ্ধতির সংকলনগ্রন্থ রচনা করেন, যা 'চরক সংহিতা' নামে সমাধিক পরিচিত।
প্রাচীন যুগে বাংলা নামে কোনো অর্থও রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিলনা। মূলত, বাংলার যাত্রা শুরু হয় বিক্ষিপ্ত জনপদগুলোর মধ্য দিয়ে। গুপ্ত, পাল ও সেন প্রভৃতি আমলের উৎকীর্ণ শিলালিপি ও বিভিন্ন সাহিত্যগ্রন্থে প্রাচীন বাংলায় প্রায় ১৬টি জনপদের কথা জানা যায় (বাংলায় ছিল ১০টি)। জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন জনপদ হল পুত্র (পুণ্ড্রবর্ধন)। তবে প্রতিটি জনপদের সীমানা সবসময় একইরকম না থাকলেও প্রাচীন বাংলার চিরায়ত আবহ ধারন করে রেখেছে এই শত শত জনপদসমূহ।
বাংলার প্রাচীন জনপদ সমূহঃ
| প্রাচীন জনপদ | বর্তমান অঞ্চল |
| গৌড় | ভারতের মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, বর্ধমান ও বাংলাদেশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ |
| বঙ্গ | ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী, বগুড়া, পাবনা, ঢাকা, কুষ্টিয়া, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর কিছু অংশ এবং ময়মনসিংহের কিছু অংশ |
| পুণ্ড্র | বগুড়া, দিনাজপুর, রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চল |
| হরিকেল | সিলেট এবং চট্টগ্রামের অংশবিশেষ |
| সমতট | কুমিল্লা ও নোয়াখালী |
| বরেন্দ্র | বগুড়া, দিনাজপুর, রাজশাহী ও পাবনা |
| চন্দ্রদ্বীপ | বরিশাল |
| উত্তর রাঢ় | মুর্শিদাবাদের পশ্চিমাংশ, বীরভূম, বর্ধমান জেলার কাটোয়া |
| দক্ষিণ রাঢ় | বর্ধমানের দক্ষিণাংশ, হুগলি ও হাওড়া |
| তাম্রলিপ্ত | হরিকেলের দক্ষিণে বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুক |
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ ছিল- পুন্ড্র। এর রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর/পুণ্ড্রবর্ধন। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়। এর সীমানা রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া (শর্টকাট- রংরাদিব)। পাথরের চাকতিতে খোদাই করা লিপি (প্রাচীনতম) পাওয়া যায়- পুণ্ড্রতে। পুন্ড্র জাতির উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক সাহিত্য ও মহাভারতে। প্রাচীন পুন্ড্র রাজ্য স্বাধীন সত্তা হারায় সম্রাট অশোকের রাজত্বকালে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
জনপদের
প্রদেশের
গ্রামের
নগরের
গৌড় রাজ্য: বাংলার পশ্চিম এবং উত্তরাঞ্চল জুড়ে ছিল এর অবস্থান। গুপ্ত রাজাদের অধীনে বড় কোনো অঞ্চলের শাসনকর্তাকে বলা হত 'মহাসামন্ত'। শশাঙ্ক ছিলেন গুপ্ত রাজা মহাসেন গুপ্তের একজন মহাসামন্ত। শশাঙ্ক ৫৯৪ খ্রিষ্টাব্দে গৌড় অঞ্চলে ক্ষমতা দখল করে স্বাধীন গৌড় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোকে গৌড় নামে একত্রিত করেন। শশাঙ্কের উপাধি ছিল রাজাধিরাজ (তিনি ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজা।) শশাঙ্ক রাজধানী স্থাপন করেন কর্ণসুবর্ণে। এটি ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায়।
গৌড় জনপদ গড়ে উঠেছিল ভাগীরথী নদীর তীরে। গৌড়ের রাজধানী ছিল- কর্ণসুবর্ণ। কর্ণসুবর্ণ এর অবস্থান ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলায়। গৌড় জনপদের একমাত্র বাংলাদেশের জেলা- চাঁপাইনবাবগঞ্জ। এর সীমানা ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া (শর্টকাট- চাপাই মামুন)। গৌড়ের স্বাধীন নৃপতি ছিলেন গৌড়রাজ শশাংক। শশাঙ্কের শাসনামলের পরে বঙ্গদেশ তিনটি জনপদে বিভক্ত ছিল। যথা পুণ্ড্র, গৌড়, বঙ্গ রাজাদের গৌড়রাজ উপাধির জন্য গৌড় জনপদটি পরিচিতি লাভ করে। ৬৩৭ খ্রিস্টাব্দে রাজা শশাঙ্কের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলায় সৃষ্টি হয়- মাৎস্যন্যায়।
আরো কিছু প্রশ্নঃ
→ প্রাচীন গৌড় নগরীর অংশবিশেষ অবস্থিত- চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়।
→ শশাঙ্কের রাজধানী মুর্শিদাবাদের কর্ণসুবর্ণের অবস্থান ছিল- গৌড় অঞ্চলে ।
→ রাজা শশাঙ্কের শাসনামলের পরে বঙ্গদেশ বিভক্ত ছিল- ৩টি জনপদে (পুণ্ড্র, গৌড় ও বঙ্গ)।
→ গৌড় অঞ্চলের অনেক শিল্প ও কৃষিজাত দ্রব্যের উল্লেখ পাওয়া যায়-
কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র' গ্রন্থে।
→ তৃতীয় ও চতুর্থ শতকে গৌড়ের নাগরিকদের বিলাস-ব্যসনের পরিচয় পাওয়া যায়-
বাৎসায়নের গ্রন্থে।
→ গৌড় অঞ্চলের সমৃদ্ধি বেশি ছিল-
পাল আমলে।
→ মুসলিম যুগের শুরুতে মালদহ জেলার যে অঞ্চল গৌড় নামে অভিহিত হতো-
লক্ষ্মণাবতী।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
শেরশাহ
হুমায়ুন
জাহাঙ্গীর
আকবর
ঐতরেয় আরণ্যক গ্রন্থে সর্বপ্রথম 'বঙ্গ' শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দু'টি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। একটি বিক্রমপুর এবং অন্যটি নাব্য (নিচু জলাভূমি) এর সীমানা ছিল ঢাকা, গাজীপুর, ফরিদপুর, খুলনা, বরিশাল, বাগেরহাট, পটুয়াখালী। দেশবাচক বাংলা শব্দের প্রথম ব্যবহার হয় আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরি আছে। গঙ্গা ও ভাগীরথীর মাঝখানের অঞ্চলকে বলা হতো বঙ্গ। প্রাচীন বঙ্গ দেশের সীমানার উল্লেখ পাওয়া যায় ড. নীহাররঞ্জন রায়ের "বাঙ্গালির ইতিহাস" নামক গ্রন্থে।
বঙ্গ রাজ্য : দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম বাংলার দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে ছিল এর অবস্থান। গোপচন্দ্র, ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেব নামে তিন জন রাজা 'মহারাজাধিরাজ' উপাধি গ্রহণ করে স্বাধীন বঙ্গ রাজ্য শাসন করতেন।
হরিকেল জনপদের অবস্থান ছিল বাংলার পূর্ব প্রান্তে। হরিকেল জনপদের রাজধানী ছিল- শ্রীহট্ট (সিলেট)। সীমানা সিলেট থেকে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
বঙ্গের প্রতিবেশী জনপদ হিসেবে সমতটের অবস্থান। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত অঞ্চলকে বলা হতো সমতট। সমতটের রাজধানী- বড় কামতা, কুমিল্লা শহর থেকে দূরত্ব- ১২ মাইল। এর সীমানা বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী। কুমিল্লার ময়নামতিতে শালবন বিহার অবস্থিত। হিউয়েন সাং-এর বিবরণ অনুসারে কামরূপে সমতট নামে জনপদ ছিল।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রী উত্তরবঙ্গের একটি প্রাচীন জনপদ। এ জনপদটি গঙ্গা ও করতোয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে গড়ে ওঠে। জনপদটির অন্য আরেকটি নাম- বারেন্দ্রী জনপদ। সীমানা ছিল রংপুর, রাজশাহী, দিনাজপুর ও পাবনা জেলা (শর্টকাট- রংয়াদিপ)। পালদের পিতৃভূমি বলা হয়- বরেন্দ্র জনপদকে। বাংলাদেশের প্রথম যাদুঘর “বরেন্দ্র যাদুঘর" রাজশাহীতে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯১০ সালে।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
হরিকেলের দক্ষিণে অবস্থিত ছিল তাম্রলিপ্ত জনপদ । সপ্তম শতক থেকে এটি দণ্ডভুক্তি নামে পরিচিত হতে থাকে। গ্রিব বীর টলেমির মানচিত্রে বাংলায় 'তমলিটিস' নামে বন্দরনগরীর উল্লেখ পাও যায়, যা বাংলার প্রাচীনতম বন্দর।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
বরিশাল জেলার পূর্ব নাম বাকলা-চন্দ্রদ্বীপ। বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষুদ্র জনপদ চন্দ্রদ্বীপ। এ প্রাচীন জনপদটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল। বর্তমান বরিশাল জেলাই ছিল চন্দ্রদ্বীপের মূল ভূ-খণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
রাঢ় জনপদের অপর নাম সূক্ষ্ম (রহস্যময়ী) জনপদ । রাঢ়ের রাজধানী কোটিবর্ষ। সীমানা ভাগীরথী নদীর পশ্চিম তীরবর্তী অঞ্চল ।
# বহুনির্বাচনী প্রশ্ন
কামরূপ জনপদ রংপুর, ভারতের জলপাইগুড়ি ও আসামের কামরূপ জেলা নিয়ে বিস্তৃত ছিল।
Read more